বাবা প্রবাসে, মা আর ছেলের
বৃষ্টি পড়ছিল সেদিন। কলকাতার একটা ছোট্ট বাড়ির ছাদে ঝমঝম করে জল পড়ছে। ছোট্ট রাহুল জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। তার হাতে একটা পুরনো মোবাইল ফোন। ফোনটা মায়ের। রাহুল বারবার স্ক্রিনে আঙুল বোলাচ্ছে। বাবার ছবিটা দেখছে। ছবিতে বাবা হাসছে। সাদা শার্ট পরা, চোখে একটু ক্লান্তি। ছবিটার নিচে লেখা— “প্রবাসে তোমার বাবা”।
মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা চামচ। ডাল ফুটছে। মায়ের চোখে জল। কিন্তু রাহুলকে দেখাবে না বলে চোখ মুছে ফেলছে।
“মা, বাবা কবে আসবে?” রাহুল হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
মা একটু চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “শীঘ্রই আসবে বাবা। কাজ শেষ হলেই আসবে।”
রাহুল জানে, “শীঘ্রই” মানে আরও কয়েক মাস। বাবা দুবাইতে। গত তিন বছর ধরে। প্রথমে বলেছিল এক বছর। তারপর আরও এক বছর। তারপর আরও। এখন তৃতীয় বছর চলছে।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। মা আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে। রাহুল বাবার ঘরে গিয়ে বসেছে। ঘরটা খালি। বাবার জামাকাপড় আলমারিতে ঝুলছে। একটা পুরনো ঘড়ি টেবিলের উপর। ঘড়িটা বন্ধ। রাহুল ঘড়িটা হাতে নিল। বাবা যখন বাড়ি থাকত, তখন এই ঘড়িটা বাবার হাতে থাকত। বাবা বলত, “সময় অনেক দামি, রাহুল। সময় নষ্ট করো না।”
রাহুল এখন সময় নষ্ট করে। প্রতিদিন। বাবার অপেক্ষায়।
রাত হয়ে গেল। মা ডাকল, “রাহুল, খেতে এসো।”
রাহুল খেতে এল। টেবিলে দুটো প্লেট। একটা মায়ের, একটা রাহুলের। মাঝখানে একটা খালি জায়গা। বাবার জায়গা। মা প্রতিদিন সেই জায়গায় একটা গ্লাস জল রেখে দেয়। কেউ জানে না কেন। রাহুল একবার জিজ্ঞেস করেছিল। মা বলেছিল, “বাবা ফিরে এলে যাতে তৃষ্ণা না পায়।”
রাতের খাবার শেষ হলে মা টিভি চালু করল। কিন্তু কেউ দেখছে না। রাহুল মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। মায়ের হাত রাহুলের চুলে বুলোচ্ছে। মায়ের হাতটা একসময় খুব নরম ছিল। এখন একটু রুক্ষ। কাজের হাত।
“মা, বাবা কি আমাদের ভুলে গেছে?” রাহুল হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
মা থমকে গেল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “না বাবা। বাবা আমাদের ভোলেনি। বাবা আমাদের জন্যই প্রবাসে আছে। তোমার পড়াশোনার জন্য, আমাদের বাড়ির জন্য। বাবা প্রতিদিন রাতে তোমার কথা ভাবে। আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে, ‘রাহুল কেমন আছে? খেয়েছে তো? পড়াশোনা করছে তো?’”
রাহুল চুপ করে রইল। তার চোখে জল এসে গেছে। কিন্তু সে কাঁদবে না। বাবা বলেছিল, “ছেলেমানুষ কাঁদে না।”
রাত গভীর হল। রাহুল ঘুমিয়ে পড়েছে। মা একা বসে আছে। মোবাইলে বাবার নম্বর দেখছে। কল করবে কি না ভাবছে। শেষে কল করল।
ফোন বেজে উঠল। দুবাইয়ের রাত। বাবা তখনও কাজে। নির্মাণ সাইটে। হাতে হেলমেট। ঘামে ভেজা শার্ট। ফোনটা দেখেই মুখে একটু হাসি ফুটল।
“হ্যালো…” বাবার গলা।
“আমি…” মায়ের গলা কেঁপে উঠল।
“কেমন আছো? রাহুল?”
“ভালো আছে। তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল।”
বাবা একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, “বলো ওকে, বাবা শীঘ্রই আসবে। এইবারের চুক্তি শেষ হলেই। আর তিন মাস।”
মা জানে, তিন মাস মানে হয়তো আরও ছয় মাস। কিন্তু কিছু বলল না। শুধু বলল, “সাবধানে থেকো। খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করো।”
ফোন কেটে গেল। মা আবার একা। জানালার বাইরে বৃষ্টি এখনও পড়ছে।
সকাল হল। রাহুল স্কুলে যাবে। মা তার টিফিন বানাচ্ছে। ডিম ভাজা, রুটি, একটু ফল। রাহুল স্কুলের পোশাক পরে এল। মা তার চুল আঁচড়ে দিল।
“মা, আজ ক্লাসে টিচার জিজ্ঞেস করবে, বাবা কী করেন। আমি কী বলব?”
মা একটু থেমে গেল। তারপর বলল, “বলো, বাবা বিদেশে কাজ করেন। আমাদের জন্য।”
রাহুল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কিন্তু তার মনে হল, অন্য ছেলেদের বাবারা স্কুলের অনুষ্ঠানে আসে। রাহুলের বাবা কখনও আসেনি।
স্কুল থেকে ফিরে রাহুল দেখল, মায়ের চোখ লাল। কেঁদেছে। কিন্তু মা হাসছে।
“কী হয়েছে মা?”
“কিছু না। বাবা ফোন করেছিল। তোমার জন্য একটা উপহার পাঠিয়েছে। পার্সেল আসবে কাল।”
রাহুলের মুখে হাসি ফুটল। উপহার! বাবা পাঠিয়েছে!
পরের দিন পার্সেল এল। একটা বড় বক্স। রাহুল খুলে দেখল— একটা নতুন ক্রিকেট ব্যাট, একটা বল, আর একটা চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
“প্রিয় রাহুল,
তোমার বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসে। এই ব্যাট দিয়ে ভালো করে খেলো। বড় হয়ে ভালো মানুষ হও। মায়ের কথা শোনো। আমি শীঘ্রই আসব। তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
তোমার বাবা।”
রাহুল চিঠিটা বারবার পড়ল। তারপর ব্যাট হাতে নিয়ে উঠোনে গিয়ে খেলতে লাগল। একা একা। কল্পনায় বাবা তার সঙ্গে খেলছে।
দিন চলে যায়। মাস চলে যায়। রাহুল বড় হয়। ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্স। সিক্স থেকে সেভেন। বাবা এখনও আসেনি।
একদিন রাতে বাবা ফোন করল। গলাটা একটু অদ্ভুত।
“আমি… আমি একটু অসুস্থ। চিন্তা কোরো না। শীঘ্রই সেরে উঠব।”
মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। রাহুল শুনে ফেলেছে। সে চুপ করে মায়ের পাশে বসে রইল।
পরের কয়েকদিন বাবা ফোন করেনি। মা বারবার কল করছে। কেউ ধরছে না।
রাহুল স্কুলে যাচ্ছে না। মায়ের পাশে বসে আছে। দুজনেই চুপ।
একদিন সকালে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। রাহুল দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল।
বাবা!
বাবা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা ছোট ব্যাগ। চেহারাটা ক্লান্ত। চোখের নিচে কালি। কিন্তু হাসি মুখে।
রাহুল এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর দৌড়ে গিয়ে বাবার গলায় হাত জড়িয়ে ধরল। কাঁদছে। জোরে জোরে কাঁদছে।
মা এসে দাঁড়াল। তার চোখেও জল। বাবা মাকে দেখে মাথা নামিয়ে নিল।
“ক্ষমা করো…” বাবা বলল। “অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
তিনজনে একসঙ্গে বসল। বাবা বলল, কাজ শেষ। আর প্রবাসে যাবে না। এবার বাড়িতেই থাকবে। রাহুলের সঙ্গে খেলবে। মায়ের সঙ্গে সময় কাটাবে।
রাহুল জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কি সত্যি আর যাবে না?”
বাবা রাহুলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “না বাবা। আর যাব না। এবার তোমার সঙ্গেই থাকব।”
সন্ধ্যা হল। বৃষ্টি পড়ছে আবার। কিন্তু আজ আর কেউ একা নয়। তিনজনে একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছে। বাবার হাতে আবার সেই পুরনো ঘড়ি। ঘড়িটা এখন চলছে।
রাহুল মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। মাও হাসল। বাবাও হাসল।
বাড়িটা আজ অনেক বড় মনে হচ্ছে। কারণ আজ বাবা বাড়িতে।
গল্পটা এখানেই শেষ নয়। কারণ এরপর অনেক দিন গেল। রাহুল বড় হল। কলেজে ভর্তি হল। বাবা আর মা পাশেই রইল। কখনও কখনও রাহুল মনে করে সেই বৃষ্টির রাতের কথা। যখন বাবা প্রবাসে ছিল। আর মা আর সে একা একা অপেক্ষা করত।
কিন্তু এখন আর অপেক্ষা করতে হয় না। বাবা বাড়িতে। আর সেই খালি জায়গায় এখন আর গ্লাস জল রাখতে হয় না। কারণ বাবা নিজেই আছে।